শেখ মুজিবুর রহমান এর মৃত্যুর পর বাংলাদেশে তার দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষতা অনেকটাই আদর্শচ্যুত হয়ে গেছে। যার কারণে প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষতার একটা মৌলিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। আর যদি ইউরোপীয় কনভেনশনাল ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হতো তাহলে ধর্মমন্ত্রনালয়ের প্রয়োজন পড়তো না।
তাহলে মুসলিম আইন হিন্দু আইন আলাদা আলাদা হওয়ার কোন দরকারই ছিল না। রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধ ধর্ম থেকে কখনোই মুক্ত নয়। রাষ্ট্রীয় বিধি নিষেধ গুলো কোন না কোনভাবে ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে স্বাভাবিকভাবে।
তবে এটাও সত্য যে বাংলাদেশের মত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমূহ শতভাগ ধর্মীয় আইন দ্বারা পরিচালিত হয় না।
ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্ম হয়েছিল মূলত সেখানকার ধর্মযাজকদের ধর্মের নামে শত শত বছর যাবত পরিচালিত বিভিন্ন অপকর্ম এর বিরোধিতা করতে গিয়ে।
এর জন্য ইউরোপের সাধারণ মানুষের মধ্যে যখন ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে তখন ইউরোপে তাদের নিজস্ব ধর্ম এখন আর মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে না।
এর পিছনে বিগত এক হাজার বছরের ধর্মের নামে বিভিন্ন অপকর্ম দায়ী।
কেননা ইউরোপের প্রচারিত খ্রিস্টান ধর্ম শ্রেণি, বর্ণ, আভিজাত্য ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় দ্বারা মানুষকে বিভাজন করত। যার ফলে সাধারণ মানুষের ভিতর থেকে ধর্ম বিরোধী মনোভাব জাগ্রত হয়।
তবে মুসলিম বিশ্বে এরকম শ্রেণিকরণ খুব বেশি একটা লক্ষ্য করা যায় না। এর জন্য সাধারণ মুসলমানদের ধর্ম বিরোধী মনোভাব গড়ে ওঠার সম্ভাবনা খুবই নগণ্য। যার ফলে মুসলিম বিশ্বের ধর্মনিরপেক্ষতা গুলো ইউরোপের কনভেনশনাল ধর্মনিরপেক্ষতার মতো হয়নি।
তবে ব্যতিক্রম হলো তুরস্ক এবং মধ্য এশিয়ার মুসলমান রাষ্ট্রগুলো।
কেননা এই রাষ্ট্রগুলোতে যখন রাজতন্ত্রের অবসান হয় ঠিক তার পাঁচ থেকে দশ বছর পরেই এ রাষ্ট্রগুলোতে ধর্মবিরোধী সরকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
এ কারণ হলো এই রাষ্ট্রগুলোতে ভিতর থেকে ধর্ম বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছে বিগত একটা দীর্ঘ সময় ধরে।
কারণ এই রাষ্ট্রসমূহে ধর্মের নামে এরকম অনেক কিছুই হয়েছে যা দ্বারা সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত হয়েছে, শ্রেণিকরণ হয়েছে, বর্ণবৈষম্য হয়েছে, সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থা অভিজাত শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণ করত।
আর এই সমস্ত কর্মকাণ্ড সব সময় করা হতো ধর্মের নামে।
যার ফলে পরবর্তী সময়ে সেক্যুলার তুরস্ক বা সেকুলার তাজিকিস্তান রাষ্ট্র গুলো কাঠামো ধর্ম থেকে অনেক বেশি দূরে সরে গিয়েছিল।
ঠিক একই জিনিস লক্ষ্য করা যায় ১৯৪৮ সালের পরবর্তী সময়ে তউকালিন পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৪৮
সালের পূর্বে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ধর্মীয় চেতনা বিশেষ করে মুসলিমদের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় চেতনা বিকাশ লাভ করে। যার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান তার রাষ্ট্রব্যবস্থা এর মধ্যে ধর্মকে মৌলিকভাবে আনতে পারেনি।
উল্টো বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠী বিভিন্ন তত্ত্ব দ্বারা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে শাসন করার চেষ্টা করেছে।
সেটা আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের নামে অথবা বিতর্কিত শরীফ শিক্ষা নীতির মাধ্যমে।
এমনকি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধীনস্থ শাসকগোষ্ঠী দেশ পরিচালনায় সবসময়ই আভিজাত্য পরিবার বা গোষ্ঠীগুলোর উপর নির্ভরশীল ছিল।
আর শাসকগোষ্ঠী এসমস্ত অপকর্ম গুলোতে বৈধতা দেওয়ার জন্য ধর্মের নাম ব্যবহার করত।
যার ফলশ্রুতিতে রাজনীতিতে ধর্মের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের ভিতরে ধর্মীয় রাজনীতি বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হয়।
যার বিবর্তন আপনি দেখতে পারবেন- প্রথমে মুসলিম লীগ,এর পর আওয়ামী মুসলিম লীগ, এরপর আওয়ামী লীগ।
ঠিক এভাবে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধর্ম থেকে দূরে সরে এসেছে।
আর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা সরাসরি ধর্মভিত্তিক করা সম্ভব হয়নি।
এর মূল কারণ ছিল গত ২৫ বছরে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানের ব্যর্থতা।
তবে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতা গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের যে একটি নতুন ধারা প্রণয়ন করার চেষ্টা করেছেন সে ধারাটিকে মিশরের কামাল আবদুল নাসের চিন্তাভাবনার সাথে মিলানো যায়।
একে বলা যেতে পারে ধর্মীয় আবহ তে বড় হওয়া একজন মানুষ তারা সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া একটি বিপ্লবী নীতি।
এর জন্য লক্ষ্য করা যায় মিশরের প্রেসিডেন্ট কামাল আবদুল নাসের নিজে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোতে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের সমন্বয় রাষ্ট্রপরিচালনা করলেও মিশরের ধর্মীয় প্রভাব কখনো নষ্ট হয়নি। এমনকি তিনি নিজের থেকেও মিশরের ধর্মীয় প্রভাব খর্ব করার কোনো চেষ্টাই করেননি।
বঙ্গবন্ধু চিন্তাভাবনা অনেকটা এরকমই ছিল।
যার ফলশ্রুতিতে ভারত এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহের সাথে এক ধরনের অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছিল স্বাধীনতার দুই বছর পরে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এধরনের বিপ্লবী চিন্তাধারার কারণে তাকে নিয়ন্ত্রণ করাটা যখন অনেক বেশি কঠিন হয়ে যাওয়া সম্ভবনাই পতিত হলো ঠিক সেই মুহূর্তেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এমনকি পরবর্তী সময়ে তাকে আমাদের সামনে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এক শ্রেণির মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধর্মবিরুধি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করার জোড় প্রচেষ্টা চালায়। এবং কি কিছু ক্ষেত্রে সফলও হয়।
কিন্তু এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণীত কাজ।
কারণ শেখ মুজিবুর রহমান যে সাম্যবাদী চিন্তার আলোকে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তার সাথে ধর্মের কোন সংঘর্ষ নেই।
কারণ এই সাম্যবাদের সাথে ইসলামের মিল সবচেয়ে বেশি পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের চেয়ে।
আর একই সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর নীতি নৈতিকতাও ছিলো আকাশচুম্বী, যা নিয়ে বাঙালি জাতির গর্বিত থাকা উচিত।
মানুষকে নিয়ে, বাঙালিদের নিয়ে, মুসলমানদের নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর চিন্তা চেতনা অবশ্যই শিক্ষনীয় বিষয়বস্তু হয়ে ইতিহাসে থেকে যাবে সবসময়ের জন্য।
সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মানুষের জন্য যে ইনসাফ, সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছেন সবসময়। তা নিয়ে আরও বেশি চর্চা করা দরকার।

Comments
Post a Comment